Blog

জৈব সার বনাম রাসায়নিক সার: কোনটা কখন দরকার

জৈব সার বনাম রাসায়নিক সার

জৈব সার বনাম রাসায়নিক সার: কোনটা কখন দরকার

মাঠে দাঁড়িয়ে অনেক কৃষক একটাই প্রশ্ন করেন — গোবর সার দেব, নাকি ইউরিয়া ছিটাব? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটা একটু হিসাবের। কারণ দুই ধরনের সার দুই কাজ করে। একটা মাটিকে বাঁচায়, আরেকটা ফসলকে দ্রুত খাবার দেয়। ভুল সময়ে ভুল সার দিলে টাকাও যায়, ফলনও কমে।

জৈব সার ও রাসায়নিক সার আসলে কী করে

জৈব সার বলতে গোবর সার, কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট, সবুজ সার আর খামারজাত বর্জ্যকে বোঝায়। এগুলো ধীরে পচে, মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ায়।

রাসায়নিক সার কাজ করে অন্যভাবে। ইউরিয়া গাছকে নাইট্রোজেন দেয়, টিএসপি দেয় ফসফরাস, এমওপি দেয় পটাশ। বাজারে প্রচলিত ইউরিয়ায় থাকে ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন, টিএসপিতে ৪৬ শতাংশ ফসফেট আর এমওপিতে ৬০ শতাংশ পটাশ। মাত্রা ঠিক থাকলে ফল দ্রুত মেলে। বেশি পড়লে গাছ পোড়ে, মাটি শক্ত হয়।

দেশের মাটি এখন কী বলছে

পরিসংখ্যান ছবিটা পরিষ্কার করে দেয়। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়, আর মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি থেকে আসে। অথচ মাটির অবস্থা উন্নত হয়নি। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (SRDI) তথ্য অনুযায়ী দেশের অধিকাংশ মাটিতে জৈব পদার্থ ১.৫ শতাংশেরও কম, যেখানে সুস্থ জমির জন্য ন্যূনতম ২.৫ শতাংশ দরকার। বিএআরসি-র হিসাবে প্রায় ৭৫ লাখ হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি দেখা যায়।

অর্থাৎ সার বাড়লেও উর্বরতা বাড়ছে না। কারণটা সহজ — খাবার দেওয়া হচ্ছে, মাটির শরীর মেরামত হচ্ছে না।

রাসায়নিক সার কখন দরকার

ফসলের যখন দ্রুত পুষ্টি লাগে, রাসায়নিক সার তখনই সেরা সমাধান। বোরো ধানে কুশি গজানোর সময়, ভুট্টায় ৬ থেকে ৮ পাতার পর্যায়ে, সবজিতে ফুল আসার আগে — এই সময়গুলোতে গাছ সরাসরি গ্রহণযোগ্য নাইট্রোজেন চায়।

মাটি পরীক্ষায় নির্দিষ্ট উপাদানের ঘাটতি ধরা পড়লেও রাসায়নিক সারই ভরসা। জিংক, বোরন বা সালফারের ঘাটতি গোবর সার দিয়ে পূরণ হতে অনেক সময় লাগে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশকৃত মাত্রা এখানে মেনে চলা জরুরি, কারণ ইউরিয়া তিন-চার কিস্তিতে ভাগ করে দিলে অপচয় অনেকটা কমে।

শিল্প ও কৃষিখাতের মানসম্পন্ন কেমিক্যাল ও রাসায়নিক উপকরণ কেনার সময় উৎসের বিশুদ্ধতা যাচাই করে নিন — ভেজাল সার মাটির ক্ষতি করে বেশি, কাজ করে কম। নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর তালিকা দেখতে পারেন Chemsyte থেকে।

জৈব সার কখন দরকার

জমি তৈরির সময় জৈব সার প্রয়োগের আসল সময়। শেষ চাষের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে দিলে পচন সম্পূর্ণ হয়, গাছের শিকড় সহজে খাবার পায়।

বেলে মাটিতে পানি ধরে রাখতে, এঁটেল মাটি ঝুরঝুরে করতে, আর টানা তিন ফসলের চাপে ক্লান্ত জমিকে বিশ্রাম দিতে জৈব সারের বিকল্প নেই। ফলের বাগান, সবজি ক্ষেত আর ছাদকৃষিতে এর ফল সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। প্রতি শতকে ৪০ থেকে ৫০ কেজি ভালোভাবে পচা গোবর সার একটা কার্যকর শুরু।

ধৈর্য লাগে। ফল আসে দেরিতে, কিন্তু টেকে অনেক বছর।

সমন্বিত ব্যবহারই সবচেয়ে লাভজনক

কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যাকে সমন্বিত উদ্ভিদ পুষ্টি ব্যবস্থা (IPNS) বলে, বাস্তবে সেটাই সবচেয়ে কাজের। মোট নাইট্রোজেন চাহিদার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জৈব উৎস থেকে নিন, বাকিটা রাসায়নিক সার থেকে পূরণ করুন।

এতে দুটো লাভ। ইউরিয়ার পরিমাণ কমে, সারের খরচ কমে। আবার মাটির জৈব পদার্থ ধীরে ধীরে বাড়ে, পরের মৌসুমে কম সারেই ভালো ফলন আসে। মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিলে হিসাবটা আরও নিখুঁত হয়; এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় SRDI এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে।

যে ভুলগুলো প্রতি মৌসুমে টাকা নষ্ট করে

কাঁচা গোবর সরাসরি ক্ষেতে দিলে আগাছার বীজ ছড়ায়, গাছের শিকড় পুড়ে যায়। রোদে শুকনো জমিতে ইউরিয়া ছিটালে নাইট্রোজেন বাতাসে উড়ে যায়। পানি জমা অবস্থায় টিএসপি দিলে ফসফরাস মাটিতে আটকে থাকে, গাছ পায় না।

আরেকটা বড় ভুল — প্রতিবেশীর ক্ষেত দেখে সার দেওয়া। জমি আলাদা, মাটি আলাদা, ফসল আলাদা। মাত্রাও আলাদা হওয়া উচিত।

সিদ্ধান্তটা যেভাবে নেবেন

ফসলের বয়স দেখুন, মাটির ধরন বুঝুন, হাতে সময় কতটুকু আছে হিসাব করুন। তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণে রাসায়নিক সার, দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতায় জৈব সার। দুটোর ভারসাম্যেই টেকসই ফলন আসে।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

জৈব সার আর রাসায়নিক সারের মধ্যে পার্থক্য কী?
জৈব সার প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসে, ধীরে কাজ করে এবং মাটির গঠন উন্নত করে। রাসায়নিক সার নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান দ্রুত সরবরাহ করে, তবে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ায় না।

জৈব সার ও রাসায়নিক সার একসাথে দেওয়া যাবে কি?
হ্যাঁ, যাবে। তবে জৈব সার জমি তৈরির সময় দিন আর রাসায়নিক সার গাছের বৃদ্ধির পর্যায় অনুযায়ী কিস্তিতে প্রয়োগ করুন। একসাথে মিশিয়ে ছিটানো ঠিক নয়।

রাসায়নিক সার বেশি দিলে কী ক্ষতি হয়?
মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়ায় গাছ শুধু পাতা বাড়ায়, দানা কম ধরে। মাটির অম্লতা বাড়ে, উপকারী অণুজীব কমে যায় এবং উৎপাদন খরচ অযথা বেড়ে যায়।

গোবর সার প্রতি শতকে কতটুকু দিতে হয়?
সাধারণ সবজি ও ধানের জমিতে প্রতি শতকে ৪০ থেকে ৫০ কেজি ভালোভাবে পচা গোবর সার যথেষ্ট। বেলে মাটিতে পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো যায়।

মাটি পরীক্ষা কেন জরুরি?
মাটি পরীক্ষা ঘাটতির প্রকৃত চিত্র দেয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় সার কেনা বন্ধ হয়, সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা যায় এবং প্রতি মৌসুমে সারের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *